আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই (AI) প্রযুক্তির ট্রাফিক মামলার নামে ভুয়া খুদে বার্তা (এসএমএস) পাঠিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক নতুন ফাঁদ তৈরি করেছে ডিজিটাল প্রতারক চক্র। সম্প্রতি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) লোগো ও নাম ব্যবহার করে এমন অসংখ্য ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর বার্তা নাগরিকদের মুঠোফোনে পাঠানো হচ্ছে, যা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
যেভাবে পাতা হচ্ছে প্রতারণার ফাঁদ
সম্প্রতি নিয়াজ মোর্শেদ নামের ঢাকার এক বেসরকারি চাকরিজীবী বিআরটিএ’র নামে একটি ভুয়া খুদে বার্তা পান। সেখানে একটি ট্রাফিক টিকিট নম্বর উল্লেখ করে লেখা ছিল, ‘ট্রাফিক আইনের অধীনে আপনার গাড়ির ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য এটিই চূড়ান্ত সতর্কবার্তা।’ বার্তায় অতিরিক্ত গতি ও অবৈধ পার্কিংয়ের অভিযোগ এনে জরিমানা পরিশোধের জন্য একটি ওয়েবসাইটের লিংকও জুড়ে দেওয়া হয়।
মোটরসাইকেল আরোহী নিয়াজ সব সময় সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালালেও এই বার্তা পেয়ে সন্দিহান হয়ে পড়েন। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, তাঁর এক বন্ধুও হুবহু একই বার্তা পেয়েছেন, যাঁর নিজের কোনো যানবাহনই নেই। তখনই বিষয়টি স্পষ্ট হয় যে, এটি আসলে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের কাজ, যা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ডিজাইন করা হয়েছে।
ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগের সতর্কতা
এই পরিস্থিতিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ থেকে একটি বিশেষ সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। ডিএমপি স্পষ্ট জানিয়েছে, পুলিশের পক্ষ থেকে এমন কোনো ভুয়া বা বিভ্রান্তিকর বার্তা পাঠানো হচ্ছে না। একই সঙ্গে ডিজিটাল এই প্রতারণা থেকে রক্ষা পেতে নাগরিকদের জন্য ৭টি জরুরি তথ্য ও নির্দেশনা প্রকাশ করেছে ট্রাফিক বিভাগ।
প্রতারণা থেকে বাঁচতে যে ৭টি তথ্য জানা জরুরি:
১. পরীক্ষামূলক এআই প্রযুক্তির ব্যবহার: ঢাকার বিভিন্ন মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে এআই (AI) প্রযুক্তির ক্যামেরা ব্যবহার শুরু করেছে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ। এই স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী গাড়ি শনাক্ত করে ডিজিটাল মামলা দেওয়া হচ্ছে।
২. তথ্য পাঠানো হচ্ছে ডাকযোগে: প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হলেও প্রাথমিকভাবে আইন লঙ্ঘনের বিষয়টি ট্রাফিক বিভাগ ম্যানুয়ালি যাচাই করছে। এরপর মামলার বিস্তারিত তথ্য ডাকযোগের মাধ্যমে সরাসরি গাড়ির মালিকের ঠিকানায় পাঠানো হচ্ছে।
৩. দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার স্বাক্ষর: সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ অনুযায়ী, গাড়ির মালিকের ঠিকানায় পাঠানো কাগজের চিঠিতে অবশ্যই ট্রাফিক টেকনিক্যাল ইউনিটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বৈধ স্বাক্ষর থাকবে।
৪. নির্দিষ্ট ফোন নম্বর: ট্রাফিক বিভাগ থেকে কোনো খুদে বার্তা পাঠানোর প্রয়োজন হলে তা কেবল ০১৩২০-০৪২২০৭ এবং ০১৩২০-০৪২২২৭ নম্বর থেকেই পাঠানো হয়ে থাকে। এর বাইরের কোনো ব্যক্তিগত বা বিদেশি নম্বর থেকে আসা বার্তা গ্রহণযোগ্য নয়।
৫. জরিমানা পরিশোধের মাধ্যম: ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগের সব ধরণের জরিমানা শুধুমাত্র অনলাইন ব্যাংকিং সেবা ‘উপায়’ (Upay) এবং ‘সিবিবিএল’ (CBBL)-এর মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়। কোনো ব্যক্তিগত মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর বা সন্দেহজনক লিংকে টাকা পাঠানোর সুযোগ নেই।
৬. পিন বা ওটিপি চাবে না পুলিশ: ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বা কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা কখনোই নাগরিকদের ব্যক্তিগত পিন কোড, অ্যাকাউন্টের পাসওয়ার্ড কিংবা ওটিপি (OTP) জানতে চাইবে না। কেউ এমন তথ্য চাইলে নিশ্চিতভাবেই সেটি প্রতারণা।
৭. যাচাইয়ের জন্য যোগাযোগের নম্বর: ট্রাফিক এআই বা ভিডিও মামলার বিষয়ে কোনো সংশয় থাকলে সরাসরি ০১৩২০-০৪২২০৭, ০১৩২০-০৪২২২৭ অথবা জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ‘৯৯৯’-এ যোগাযোগ করে নিশ্চিত হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ।
বি.দ্র. (পাঠকদের জন্য সতর্কবার্তা): প্রতারক চক্রের মূল লক্ষ্য হলো ভুয়া লিংক পাঠিয়ে বা ভয় দেখিয়ে বিকাশ/নগদ কিংবা ব্যাংকের তথ্য হাতিয়ে নেওয়া। তাই এ ধরনের কোনো সন্দেহজনক লিংক বা মেসেজ পেলে বিভ্রান্ত না হয়ে তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশকে জানানোর অনুরোধ করা হয়েছে।




